মানুষের মনের, কল্পনার আর আগ্রহের সব থেকে কাছাকাছি যাওয়ার পথ কোনটি এই প্রশ্ন কাউকে করা হলে না ভেবেই উত্তর দেওয়া যাবে। কারণ উত্তরটি সবার জানা। “চলচ্চিত্র”। সব থেকে উত্তেজক, আবেগ ধারণ আর প্রকাশের মাধ্যম। সমগ্র বিশ্বে এখনো যে দেশের চলচ্চিত্র যত বেশি উন্নত, তারা শিল্পে তত সমৃদ্ধ। শিল্পের সব থেকে উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসাবে ধরা হয় চলচ্চিত্রকে যা কিনা প্রায় সবার সাথেই যোগাযোগ স্থাপন করার একটি সক্ষম মাধ্যম হিসাবে পরিচিত। চলচ্চিত্রকে আধুনিকীকরণের পাশাপাশি এর বিভিন্ন বিভাগও করা হয়েছে আধুনিক কালে। সব চাইতে স্পর্শকাতর আর সৃজনশীল বিভাগ হিসাবে ধরা হয় “শিশুতোষ” চলচ্চিত্রকে।

 

শিশু-কিশোরদের মন, অনুভূতিগুলো অসম্ভব কল্পনা প্রিয় এবং স্পর্শকাতর হওয়ায় এই বিভাগে পরিচালক, কাহিনীকার সকলকে দিতে  হয় আলাদা মনোযোগ।

 

 

বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা কারার পূর্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তী কতটুকু সময় পার করে এসেছে সেদিকে তাকাতে হয়। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পর প্রায সাড়ে চার দশক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পরিণত বয়সীদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রে মোটামুটি একটি অবস্থান তৈরীর পথে অগ্রসর হচ্ছে। আর শিশুতোষ চলচ্চিত্র এতোটাই পেছনে পড়ে আছে যে সেটিকে হাঁটতে না শেখা শিশুর মতোই মনে হয়। হাতে গোনা কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ না হলেতো বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে কলম ধরারও সুযোগ থাকতো বলে মনে করেন না অনেকেই। সাধারণ ভাবে শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলতে বোঝায় শিশুদের উদ্দেশ্য করে, তাদের চারপাশের জগৎ, বোঝাপড়া ও কল্পনার জগৎকে কেন্দ্র করে যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় । শিশুতোষ চলচ্চিত্র শুধুমাত্র শিশুদের অভিনীত চলচ্চিত্র নয়। শিশু অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র হতে পারে। বিশ্বজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের “গুপি-বাঘা” সিরিজের চলচ্চিত্রগুলো তার স্পষ্ট প্রমাণ।

 

স্বাধীন বাংলাদেশে সুভাষ দত্ত পরিচালিত “ডুমুড়ের ফুল” কে শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম চেষ্টা বলা যায়। যদিও ১৯৭৮ সালে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণকালে নির্মাতা শিশুদের কথা ভেবে তৈরি করেননি। তৈরি করেছেন সামগ্রিক দর্শকের কথা মাথায় রেখেই। কিন্তু এই প্রথম কোন চলচ্চিত্র শিশু-কিশোরেরা নির্ভাবনায় হলে গিয়ে দেখে। কারণ সে-সময় আশরাফ সিদ্দিকীর “গলির ধারের ছেলেটি” পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছিল খুবই পরিচিত। তাছাড়া কাহিনী প্রায় সকলের জানা ছিলো বলে অভিভাবকরাও নিশ্চিন্তে ছোটদের সিনেমা হলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে প্রথম সর্বাঙ্গীন শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে নির্মিত হয় “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী”। বাদল রহমান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি সরকারী অনুদানে নির্মিত হয়েছিল। এরিখ কাস্টনারের কাহিনি নিয়ে নির্মিত “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” চলচ্চিত্রটি শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি; সে বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, সম্পাদনা, শিশুশিল্পী, রঙিন চিত্রগ্রহণ এবং পার্শ্ব-অভিনেতা ক্যাটাগরিতে পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

 

 

বাংলাদেশে নির্মিত শিশুতোষ চলচ্চিত্রের সংখ্যা একেবারে নগণ্য, সংখ্যাটা হাতে গোনা যায়। পূর্ব পাকিস্তানের সময় প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে, ছবিটির নাম ছিল “দি সান অব পাকিস্তান”, পরিচালক ছিলেন ফজলুল হক। পাকিস্তান আমলে আর কোনো শিশুতোষ চলচ্চিত্রের নাম শোনা যায়না। মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র “ইনোসেন্ট মিলিয়নস” এ (১৯৭১) যুদ্ধের শিকার নারী ও শিশুদের ওপরে আলোকপাত করা হয়েছিল। এরপরে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সর্বাঙ্গীন শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে পাওয়া যায় “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” (১৯৮০)। অনুদানপ্রাপ্ত আরেকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র হলো “দীপু নাম্বার টু” (১৯৯৬)। মোরশেদুল ইসলামের “দূরত্ব” (২০০৪) ছবিটি নির্মিত হয়েছে বেসরকারী পর্যায়ে, ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায়।

 

 

বেসরকারী পর্যায়ে বা এফডিসি থেকে আর কোনো সর্বাঙ্গীন শিশুতোষ ছবি নির্মাণের খবর পাওয়া যায় না। তবে পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ না হলেও একসময় বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে শিশুচরিত্রের বেশ প্রাধান্য ছিলো। এরকম কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হতো যেখানে শিশুচরিত্রই ছবিতে প্রধান চরিত্র থাকতো এবং তাকে ঘিরেই ছবির কাহিনী আবর্তিত হতো। সুভাষ দত্তের “ডুমুরের ফুল” (১৯৭৮), আজিজুর রহমানের “অশিক্ষিত” (১৯৭৮) কিংবা “ছুটির ঘণ্টা” (১৯৮০), শেখ নজরুল ইসলামের “এতিম” (১৯৮০) কিংবা “মাসুম” (১৯৮১), শহীদুল আমিনের রামের “সুমতি” (১৯৮৫) ইত্যাদি ছবির প্রধান চরিত্র বা অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল শিশু-কিশোর। নব্বই দশক থেকে পারাবারিক-সামাজিক জঁরার ছবি কমে যাওয়ায়, এবং সহিংস-অপরিশীলিত রুচির ছবির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, সাম্প্রতিক ছবিগুলোতে শিশুচরিত্র থাকে না বললেই চলে, থাকলেও তার উপস্থিতি স্বল্প সময়ের জন্য এবং সেও সহিংসতার কারণ বা অনুষঙ্গ হিসেবেই ছবিতে হাজির হয়। স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র “মাটির ময়না” (২০০২) কে চাইলে একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসাবে বিবেচনা করা যায় যদিও এটির প্রেক্ষাপট বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দলন এবং একটি শিশুর মাদরাসা জীবন।

 

বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ১৯৮০ সাল থেকে শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নির্মিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের। চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে খান আতাউর রহমানের “ডানপিটে ছেলে” (১৯৮০), সি বি জামানের “পুরস্কার” (১৯৮৫), শেখ নেয়ামত আলীর “রাণীখালের সাঁকো” (১৯৯০) শিশুদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল। বাদল রহমানের “ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ” (১৯৯৯) চলচ্চিত্রটিও খানিক আলোচিত হয়েছিল। শিশু একাডেমী প্রযোজিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ। সম্প্রতি বাংলাদেশের সব থেকে সফল আর পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ চলচ্চিত্র ধরা হয় “আমার বন্ধু রাশেদ” (২০১১)-কে। ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি বাংলাদেশী যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রটি মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত একই নামের শিশুতোষ উপন্যাস অবলম্বনে বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম।

 

 

শিশুদের দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে সচেতন করে তোলা দরকার বিভিন্ন সৃজনশীল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কেননা বিশ্বায়নের এই যুগে শিশু-কিশোরদের অজ্ঞ বা মুর্খ ভাবার কোনো কারণই নেই। স্বভাবতই শিশু-কিশোরেরা রোমাঞ্চ, রূপকথা বা কল্পনাধর্মী গল্প পছন্দ করে। আর বর্তমান সময়ে শিশুদের সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় হলো অ্যানিমেশন। আর তাই শিশু একাডেমীর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর সেসব বিষয় স্পর্শ করা উচিত। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও ইউনিসেফ এর উদ্যোগে শিশু একাডেমীতে প্রতিবছর শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মান কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছুটা অনিয়মিত হলেও প্রতিবছর ৩-৪ টি করে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। যার নির্মাতা কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিশুরা। যথাযথ তত্ত্বাবধানে এ উদ্যোগ শিশু চলচ্চিত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ভাল নির্মাতা গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

বাংলাদেশ চিল্ড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন এবং তার উদ্যোগে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ বাংলাদেশের শিশু চলচ্চিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এছাড়াও বাংলাদেশ চিলড্রেন টেলিভিশন ফাউন্ডেশন ইউনিসেফের সহায়তায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করে তুলছে। শিশুরা এক মিনিট ব্যাপ্তির চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে যা তাদের ভবিষ্যতে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাতা হবার স্বপ্ন দেখায়। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন নির্মাতা শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিষয়বস্তু ও নির্মাণের দিক দিয়ে এতটাই দূর্বল যে তা উল্লেখ করার মতো না।

 

বর্তমানে বাংলা চলচ্চিত্রে পরিবর্তনের হাওয়া এসে লেগেছে। এই ছোয়া এসে লাগুক শিশুতোষ চলচ্চিত্রেও। তৈরি হোক ভাল মানের শিশুতোষ চলচ্চিত্র। শিশুতোষ চলচ্চিত্রকে কেবল বাণিজ্যিক অনুসঙ্গ হিসেবে না দেখে শিল্পের তাগিদ হিসেবে বিবেচনা করা হোক। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে চলচ্চিত্র হয়ে উঠুক সুস্থ বিনোদন ও জীবন গঠনের হাতিয়ার।

 

কারন শিশুরাই এক সময় রিপ্রেজেন্ট করবে গোটা দেশকে আর এর চলচ্চিত্র অঙ্গনকেও। এদের যাবতীয় ভিত্তি আর তাদের সাথে যোগাযোগের শক্ত মাধ্যম হচ্ছে এই চলচ্চিত্র। তাদেরকে এর মাধ্যমে যে বার্তা এই প্রজন্ম পাঠাতে পারে তা অন্য কোন মাধ্যমে একেবারেই অসম্ভব। তাই ফ্রেমে ফ্রেমে গড়ে উঠুক আগামীর স্বপ্ন।

 


 

লেখক পরিচিতি

সাদীয়া ইসলাম রোজা সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা একজন ছাত্রী। যার জীবনের লক্ষ দেশের বড় মাপের একজন সাংবাদিক হওয়া।আর জীবনের স্বপ্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সমাজের অন্ধকার দিক গুলোতে আলো ফেলার চেষ্টা করা। ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে পাশ করা এই শিক্ষার্থী জানায় যে ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা ও ফ্লিম নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় এবং এ কারনেই তার চিল্ড্রেনস্ ফিল্ম সোসাইটির প্রতি তীব্র আগ্রহ ও ভালোবাসা। ৮ম উৎসব থেকে সে “আমাদের উৎসব” নামক ফেস্টিভালের বুলেটিনের নিয়মিত লেখক।