সিনেমা দিয়ে মানুষকে ভাবাতে চাই…

একান্ত সাক্ষাৎকারে ১০ম উৎসবে পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র “Alan Kurdi From Heaven” এর পরিচালক সাইয়েদুল আবরার


‘সাইয়েদুল আবরার’ নামটা কমবেশি সিএফএস-এ সকলের কাছেই পরিচিত। ২০১২ সালে ৫ম উৎসবে একজন স্বেচ্ছাসবক হিসেবে কাজ করতে এসেছিলো আবরার। চশমা পরে ঘুরে বেড়ানো ক্লাস এইটের সেই ছোট্ট ছেলেটাই যে এর পরের বছর একটা আস্ত ছবি বানিয়ে উৎসবে জমা দেবে তা আমরা কেউই ভাবিনি। আবরারের সেই প্রথম ছবির নাম ছিলো Broken Dream। কাঁচা হাতে বানানো সেই ছবি সবার মনে ধরেছিলো বেশ। সেই থেকে শুরু করে ১০ম উৎসবে তৃতীয় পুরস্কারসহ তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত  Alan Kurdi From Heaven

‘Alan Kurdi From Heaven’ এর একটি দৃশ্য

মাঝখানে জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবেও আবরার কাজ করেছে এক উৎসবে। সিএফএস-এ কেমন চলছে আবরারের যাত্রা? আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের ১১তম আসরের বাকি আর মাত্র ১৫ দিন। তুমুল ব্যস্ততার ফাঁকে আবরারকে একটুখানি পাওয়া গেলো সিএফএস অফিসে। কথা হয় তার সাথে…
“সিএফএস-এ এসেছিলাম ফিল্মকে ভালবেসে। ছোটবেলা থেকে উৎসবে এসে ছবি দেখতাম। ৫ম উৎসবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হলেও ইচ্ছা ছিলো ছবি বানানোর। ৬ষ্ঠ উৎসবে বানালাম আমার প্রথম ছবি।“
বোঝা গেলো আবরারের নির্মাতা স্বত্বাকে সামনে আনতে সিএফএস এর অবদান অনেকটুকু। পড়াশোনা, স্কুল, কলেজ সব সামলাতে যেয়ে আবরার কখনোই বিসর্জন দেয়নি নিজের এ স্বত্বাকে। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর নির্মিত হলো সাইয়েদুল আবরারের চলচ্চিত্র  Alan Kurdi From Heaven

ভূমধ্যসাগরে ভেসে আসা মৃত সিরিয়ান শিশু অ্যালান কুর্দিকে নিয়েই এই ভিজুয়্যাল স্টোরিটেলিং ধরণের চলচ্চিত্র। গত বছর ১০ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবিটি পেয়েছে ৩য় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের খেতাব। শুধু তাই নয়, দেশের বাইরেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন উৎসব থেকে ছবিটি পেয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার। আমাদের চারপাশের সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে প্রতি বছর উৎসবে বেশ কিছু ছবি জমা পড়লেও, এরকম আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনা নিয়ে ছবি বানিয়ে জমা দেয়ার ঘটনা প্রথম আবরারই ঘটিয়েছিলো। জানতে আগ্রহ হলো, কোত্থেকে এলো আবরারের এমন ভাবনা। 

“শরণার্থী শিশুদের নিয়ে আমার ভিতরে ভাবনা কাজ করতো বেশ আগে থেকেই। আমি মনে করি এই শিশুরা পৃথিবীর সবথেকে দুর্ভাগা শিশু। ওদের না আছে রাষ্ট্র, না আছে পরিচয়। চেষ্টা করেছি আমার ছবিতে তাদের কথা তুলে ধরতে। আমার এই ছবি দিয়ে শুধু অ্যালান কুর্দি নয়, সারা পৃথিবীর সকল শরণার্থী শিশুর কথা বলতে চেয়েছি।“
আবরারের ছবিটি গত উৎসবে আলোচিত হয়েছিলো বেশ। ছবিতে স্বর্গ থেকে অ্যালান কুর্দির করুণ জবানবন্দি অনেক দর্শকের চোখে জল এনে দিয়েছিলো।
“ছবিটি বানিয়ে এটাই আমার সবথেকে বড় অর্জন। দর্শকের এই অশ্রু হাজার পুরস্কারকেও হার মানায়। আমি চেয়েছি সিনেমা বানিয়ে মানুষের ভাবনার জগতকে নাড়া দিতে। খুব শিক্ষামূলক কোনো বার্তা দেয়ার চেষ্টা না করলেও চেয়েছি যাতে আমার ছবিটি দেখে মানুষ একটু অ্যালান কুর্দির কথা ভাবে, তার কষ্টটাকে বোঝে।”

‘Alan Kurdi From Heaven’ ছবিটির একটি দৃশ্য


কথায়ই বোঝা যাচ্ছে শুধুই পুরস্কারের জন্য ছবি বানায় না আবরার। তবে কিশোর ও তরুণ নির্মাতাদের সাহায্য এবং উৎসাহের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভীষণ দরকারী বলেও মনে করে সে।


সিএফএস এর অধিকাংশ নির্মাতারা যখন ক্যামেরা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে, তখনই আবরার বানালো একটি ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং ধাঁচের ছবি। যে ছবির কাজ প্রায় পুরোটাই করা যায় একটি ঘরে বসে, একটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে। জানতে চাইলাম কেমন ছিলো এই ছবি নির্মাণের অভিজ্ঞতা। আগের ছবিগুলো থেকে সহজ নাকি কঠিন…

“আমি দু’ধরণের ছবিই বানিয়েছি। ভিজুয়্যাল স্টোরি উৎসবে আগেও দু’একটি প্রদর্শিত হয়েছে। কোনটা সহজ সেটা বলা মুশকিল, শ্রম ও ভালোবাসা সব ধরণের ছবি নির্মাণেই সমানভাবে জরুরি। ক্যামেরা কাঁধে নানা লোকেশনে দৌড়ানো নিঃসন্দেহে ভীষণ রোমাঞ্চকর, তবে শেষ পর্যন্ত দর্শককে যা দেখাতে চেয়েছি, তা দেখাতে পারলাম কি না, সেটাই মুখ্য বিষয়।”


শরণার্থী শিশুদের নিয়ে আবরারের ভাবনা এখানেই শেষ নয়। Alan Kurdi From Heaven এর পর শরণার্থী শিশুদের নিয়ে আরো দু’টি চলচ্চিত্রের কাজ করছেন তিনি। এগুলো হবে আগের ছবিটিরই সিক্যুয়াল। টু দ্য চিলড্রেন অফ প্যালেস্টাইন  নামের এই ট্রায়োলজির পরের ছবির কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। আবরার জানালো, “ট্রায়োলজি বানানোর পরিকল্পনা শুরুতে ছিলো না। আগের ছবিটির সাফল্য দেখে মনে হলো, বিষয়টা এখানেই থেমে যেতে পারে না। এ বিষয় নিয়ে মানুষকে আরো বলতে হবে, ভাবাতে হবে। দেখাতে হবে সারা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী শিশুদের দশা।”

টু দ্য চিলড্রেন অফ প্যালেস্টাইন  ছবির একটি স্থিরচিত্র


এছাড়া এবারের উৎসবে প্রদর্শিত হবে আবরারের নির্মিত নতুন ছবি  বিপ্রতীপ। আবরার জানালো নিজের জীবনে বয়সের সাথে সাথে বেড়ে ওঠার কিছু টুকরো ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই ছবি। সিএফএস এর আয়োজনে গত বছর অনুষ্ঠিত শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার অংশ হিসেবে ছবিটি তৈরি করেছে সে।
“একজন নির্মাতা হিসেবে নিজেকে কোথাও আটকে রাখতে চাইনি। বিভিন্ন ধরণের কাজ করছি। সে কারণেই আগের ছবিটি থেকে  বিপ্রতীপ একটু আলাদা। আমি নিশ্চিত এই ছবিটিও মানুষকে ভাবাবে। প্রতিটি দর্শক তার নিজ জীবনের কোনো না কোনো অংশের সাথে ছবিটিকে মেলাতে পারবেন।” আবরারের চোখে স্বপ্ন খেলা করে। সিনেমা দিয়ে বদলে দেয়ার স্বপ্ন, মানুষকে ভাবিয়ে তোলার স্বপ্ন। আবরারের সে স্বপ্নের সাথী সিএফএস-এর বাকি সবাই। সে স্বপ্ন বেঁচে থাকুক। ফ্রেমে ফ্রেমেই সফল হোক আগামী স্বপ্ন!

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন:

ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলী
Riddha Anindya Ganguly

সিএফএস এর  অন্যতম পুরানো সদস্যদের একজন। কাজ করছে সিএফএস এর জন্মলগ্ন থেকে। প্রথম উৎসবে “শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক” পদক পায় সে। দ্বিতীয় উৎসবে জুরি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করে এবং বর্তমানে উৎসবের মুখপত্র “আমাদের উৎসব” এ সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।
পড়াশুনা করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। 

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?