স্বপ্নের শুরু

Obaidullah Tushar

Obaidullah Tusharবেশী দিন আগের কথা না এইতো গত চার বছরে আমার মধ্যে যে পরিমাণ পরিবর্তন এসেছে তা আমার জীবন, চিন্তা ধারণা,কল্পনার জগতকে সম্পূর্ণ এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে । নানা রকমের অভিজ্ঞতা নানারকমের বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সব রকমের বিপদ আর সব রকমের প্রতিকূলতার মাঝে আমি আজ যেই অবস্থানে আছি তার পিছনে ছিল এবং থাকবে আমার পরিবার আর সব থেকে কাছের বন্ধুরা ।

আমার একটি সমস্যা গত দুই বছর ধরে লক্ষ্য করছি, আমার মাথায় নতুন নতুন চিন্তা আর নতুন আবিষ্কারের পাগলামো শুরু হয়। যার কোনই সীমা ছিল না, এই ধরুন আজ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বানানোর ইচ্ছা কাল হেলিকপ্টার বানানোর ইচ্ছা লেগেই থাকত। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় অনেক কিছুই এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে । তখনি হঠাৎ আমার বন্ধুদের সাথে আড্ডাতে আসে শর্টফিল্ম বানানোর ইচ্ছা তখন সবে আমরা কলেজে পড়ি, বন্ধুদের নিয়ে চিন্তা শুরু করে দেই কিভাবে শুরু করব, পরিশেষে সেই সময়ে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে তখন বানানো সম্ভব হয়ে উঠেনি কিন্তু আমি স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে জানি,কলেজ শেষের পর আবার মন দেই ফিল্ম এর উপর, তখন সাথে ছিল রিদম, সিয়াম, মিশু ,জিম, ইশতিয়াক, নিয়াজ। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবো, কীভাবে ধরব কিছুই করতে পারতেছিলাম না আমরা।

তখন হঠাৎ ২০১২-এর আগস্ট প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ বন্ধু সিয়ামকে (আমার মনের জানালায় উঁকি দেয়া) এক মেয়ে জানালো সিএফএস (Children’s Film Society) এর টিনফিল্ম ওয়ার্কশপ এর কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ মনের জালালায় উঁকি দেয়া মেয়েটি চিমটি দিয়ে চলে যায় কিন্তু আমার মনে থেকে যায় সিএফএস। যাই হোক ওয়ার্কশপ এর খোঁজ তো মিলে গেল কিন্তু ৬ তারিখ সিএফএস এর অফিসে এ গিয়ে জানতে পারলাম যে ওয়ার্কশপ এ অংশগ্রহণ করতে পার হতে হবে আরও কিছু ধাপ । প্রথমে ইন্টারভিউ দিতে হবে তারপর সিলেক্ট হলে কিছু টাকা দিতে হবে ভর্তির জন্য। ৭ তারিখ ইন্টার্রভিউ দিতে আসি আমি আর সিয়াম, অনেক এক্সাইটেড ছিলাম। আমার,জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ, সেইদিন ইন্টারভিউ প্যানেলে বসে ছিল মনন ভাই,সাথে সিএফএস এর অনেকেই।

পরদিন ফলাফল দিল। আমি সিয়াম এক সাথেই ছিলাম আমার ফোনে মেসেজ আসলো যে আমি টিকেছি কিন্তু সিয়াম এর ফলাফল টা যে এখনও তার ফোনে আসেনি, সিয়াম রীতিমত চিন্তায় পড়ে গেল, ওর মনের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল, যত সময় গেল তত কী নিয়ে যেন ভাবতো, তখনি আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি ওয়ার্কশপ এ একা ভর্তি হবো না। এই ওয়ার্কশপ এর স্বপ্ন বুনেছিলাম এক সাথে, ক্লাসও করবো একসাথে। অনেক দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম এটা নিয়ে, রাতে পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। রিদম বুঝাতে লাগলো একাই ভর্তি হতে কিন্তু আমি পারতেছিলাম না স্বার্থপর হতে, যেহেতু নতুন পরিবেশ নতুন মানুষ এর সাথে খাপ খাওয়ানোটা ছিল আমার জন্য রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। তাই আমার দরকার ছিল সিয়ামকে। এমনিতেই আমি নতুনদের সাথে ফ্রী হতে পারিনা সহজে। কিন্তু রাতে সিয়াম আমাকে বুঝানো শুরু করলো যে টাকা যোগাড় করতে ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু টাকার কথা শুনে আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি,কারণ তখন আমার কোন টাকার উপার্জনের উৎস ছিল না, বাসা থেকেও এত টাকা দিতে রাজী হচ্ছিল না, তখন আমার এক খুব কাছের মানুষ আমাকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে,তার কাছে আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তখন আমাকে সিয়াম নিয়ে যায় ভর্তি করতে, গিয়ে সিয়াম আমাকে চমকিয়ে সেও ভর্তি হয়ে যায়। পরে বলে যে সেও টিকেছিল কিন্তু আমাকে অবাক করিয়ে দেয়ার জন্য সে আর জানায়নি কিছু। কিন্তু আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে সিয়াম ছাড়া আমার ওয়ার্কশপ গেলে যেভাবে আমরা একসাথে কাজ করে উন্নতি করেছি একা থাকলে হয়ত পারতাম না আমি। তার পর বাকি টুকু শুধুই ইতিহাস। তারপর টিনফিল্ম ওয়ার্কশপে অমিতাভ রেজা স্যার, মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী স্যার এর মত বিশাল ফিল্ম মেকার দের স্পর্শ পাওয়া, এফ ডি সি এর মুরগি দিয়ে ডাল ভাত খাওয়া, ওয়ার্কশপ এর তত্ত্বাবধায়নে এক সাথে প্রথম শর্টফিল্ম বানানো ছিল স্বপ্নকে মেলে ধরার প্রথম পর্যায়।

তখনি আমরা আমাদের ওয়ার্কশপ থেকে শিক্ষা নিয়ে বন্ধুরা ফিল্ম বানানোর নেশায় নামি, শুরু করি গল্প বানানোর কাজ। ক্যামেরা নিয়ে মাঠে নামি আমরা,কিন্তু প্রথম কাজটা শেষ করতে পারিনি অনেক কিছু না জানার কারণে। কিন্তু সেখান থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি তা পরের ফিল্ম বানানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তারপরও অনেক বাধা ছিল কিন্তু আমরা যে হার মানার পাত্র নই ,শুরু করি কাজ। ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচিত্র উৎসব এ জমা দেয়ার জন্য ছবি বানানো ,বন্ধুরা মিলে একটা প্রোডাকশন হাউস দেই A3 Motion Pictures নামের,শুরু করি আমাদের ফিল্ম নামক স্বপ্নের বাস্তবায়ন এর যাত্রা। প্রথম বানাই ‘একাত্তরে’। এই একাত্তরে বানাতে গিয়েছে অনেক শ্রম অনেক আবেগ আর অনেক অশ্রু বিসর্জন। জিম, রিদম, নিয়াজ,ইশতিয়াক, শান্তনু, মিশু এদের কথা না বললে হয়ত অপূর্ণ থেকে যাবে কারণ এদের ছাড়া আমারা কেউ ফিল্ম বানাতে পারতাম না। পরে ‘একাত্তরে’ ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচিত্র উৎসব সিলেক্ট হয়েছে এটাই ছিলও আমাদের জন্য অনেক কিছু , কিন্তু সব কিছু ফেলে আমরা যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি তা ছিলও স্বপ্নের থেকেও অনেক বেশী কিছু। আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে আমরা পেয়ে গেছি আমাদের প্রথম সাফল্য।

তারপর থেকে সিএফএস পরিবার এর সাথে ভালভাবে যুক্ত হয়ে যাই। এর পর সুযোগ পাই ব্রিটিশ কাউন্সিল এর সাতদিন ব্যাপী ওয়ার্কশপ এ। আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজার এ মারমেইড রিসোর্ট এ, সেখানে আমাদের কে বানাতে দেয়া হয় নিজেদের শর্ট ফিল্ম । আমার গল্পের উপর ভিত্তি করে বিশিষ্ট ফিল্ম মেকার তাওকির ছবি বানানোর প্রস্তাব দেয়। তার পর আমরা আমাদের গ্রুপ নিয়ে নেমে পড়ি ফিল্ম বানাতে, তখন খাতির হয় আরও অনেক ফিল্ম মেকারদের সাথে । আমার জীবনের সেরা ৭দিন পার করি সেখানে।

তখন থেকে শুরু হয় আমাদের বাধাহীন ফিল্ম বানানোর প্রক্রিয়া ,মাঝে নিজে একটু ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনাও করেছি নিজে নিজে। দর্শককে বুঝানো থেকে শুরু করে আমরা এনে দিতে চেয়েছি নতুন আঙ্গিকে গল্প উপস্থপনা করার প্রক্রিয়া, কেউ কেউ গ্রহণ করেছে কেউ কেউ আবার প্রত্যাখ্যানও করেছে, সমালোচনার স্বীকার হয়েছি অনেকবার। তখনি বুঝেছি আমরা ঠিক পথেই এগুচ্ছি।

তারপর আমরা A3 Motion Pictures এর ব্যানারে সপ্তম আন্তর্জাতিক শিশু চলচিত্র উৎসব এর জন্য বানানো শুরু করি আরও ২টা ফিল্ম। এবার কাজ শেষ হয় একেবারে শেষ সময়ে, অনেক আশা নিয়ে অনেক শ্রম আর অনেক আবেগ দিয়ে বানাই আমাদের স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। কিন্তু এবার পারিনি কোন পুরস্কার জিততে কিন্তু জিতে নিয়েছি অনেকের মন, পেয়েছি নতুন করে আবার ছবি বানানোর স্বপ্ন।

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?