ফ্রেমে বন্দী স্বপ্ন

Abu-Sayeed-Nishan

আমি ছোটবেলা থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই পড়তাম। ছোটবেলা বললে ভুল হবে এটাকে শিশুবেলা বলা যেতে পারে। কারন তখন আমি থ্রি কি ফোরে পড়ি। ঐ সময়েই কখনো বাথরুমে, কখনো খাটের নিচে আবার কখনো বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া হত। এরই ধারাবাহিকতায় আমি যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম, তখনই এলাকার বড় ভাইদের সম্পাদনায় বের হওয়া ত্রৈমাসিক কিশোর পত্রিকা “হট্টগোলে” কাজ করতাম। আমার কাজ ছিল লেখা সংগ্রহ আর প্রচারণা। শুধু যে কাজ করতাম তা না। টুকটাক লেখালেখি করতাম। লেখালেখি করতে করতে একটা সময় নিজের লেখাও ছাপা হয়েছে হট্টগোলে। তাও একবার না বেশ কয়েকবার।

তারপর থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু হলো লেখক হওয়ার। পুরোদস্তুর লেখালেখি শুরু করে দিলাম। ঐতিহ্য গোল্লাছুট, এইসএসবিসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম। শুধু প্রতিযোগিতাগুলোতে লেখা দিয়ে থেমে থাকি নি, লেখা পাঠিয়েছি ত্রৈমাসিক থেকে মাসিক এরপর দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও। ছাপাও হলো বিভিন্ন পত্রিকায়। এভাবে চলছিল লেখালেখির জীবন। হঠাৎ একদিন খেলতে গিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় নজরে পড়লো চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির একটি রচনা লেখা প্রতিযোগিতার।

‘তোমার দেখা প্রিয় চলচ্চিত্র’ এই বিষয়ের উপর রচনা লিখে প্রতিনিধি হিসেবে ডাক পেলাম সাতদিন ব্যাপী এক জমকালো চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভালে। ঐ সাতদিনে ফিল্ম সম্পর্কে একটা দুর্দান্ত আইডিয়া পেলাম। মাথায় চাপলো ফিল্ম বানানোর ভূত! পরের বছর আবার আয়োজন করলো ফেস্টিভ্যালের। কিন্তু এবার রচনার সাথে যোগ হলো ফিল্ম। ফিল্মের বিভাগ দেখেই মাথা চিড়িক দিয়ে উঠলো। যে করেই হোক এবার ফিল্ম বানাবো। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। আমার এক বন্ধুকে নিয়ে যৌথ পরিচালনায় “ভূতমন্ত্র” নামে ৮ মিনিটের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ফেললাম। কথাটা শুনে ফিল্ম বানানো যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলে তা এতটা সহজ নয়। অনেক ঝড় ঝাপটা পার করেই ফিল্মটা বানাতে হয়েছিলো আমাদের। আমাদের বানানো সেই ফিল্ম শুধু নমিনেশন ই পায় নি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে জিতে নেয় দুটি বিশেষ পুরস্কারের মধ্যে একটি!

নিজের বানানো প্রথম ফিল্ম অ্যাওর্য়াড পেয়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিলাম ফিল্ম মেকার হবো। কিন্তু আমি তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। তাই ফিল্ম মেকার হওয়া আমার জন্য একটি আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। স্বপ্ন যখন দেখেছি তখন আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নই দেখবো। যত কষ্টই হোক তারপরও আমি ফিল্ম মেকার হবো।

সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই আসলো “ওয়ান মিনিট জুনিয়র”। তিনজন ফরেনারের নেতৃত্বে পাঁচ দিনের একটি ওয়ার্কশপ হলো। ঐ ওয়ার্কশপে ১৭ জন শিশু চলচ্চিত্র নির্মাতা অংশগ্রহণ করে। এবং প্রত্যেকে ১ মিনিটের একটি করে মোট ১৭টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। সেই ফিল্মগুলো নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে একটি চলচ্চিত্র উত্সবে নিয়ে যাওয়া হয়। শুধু তাই না চ্যানেল আই ঐ ওয়ার্কশপের প্রত্যেকটা ফিল্ম অন এয়ার করে এবং প্রত্যেক কে ১০০ ডলার করে সম্মানি দেয়।

নিজের ফিল্ম চ্যানেল আইতে প্রচারিত হওয়ার পর পরই এমএমসি শিশু প্রকাশের সাথে যুক্ত হই। এটি একটি সংবাদ ভিত্তিক সংস্থা। সারা ঢাকা শহর থেকে শিশু প্রকাশের ব্যানারে একটি পরীক্ষার মাধ্যেমে সেরা ১০ জন শিশু সাংবাদিক নিয়োগ দেয় এমএমসি। আমি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেরা ১০ জনের ১ জন মনোনীত হই। সাংবাদিকতার কাজ করতে করতেই চলে আসে তৃতীয় আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সব। সেই উত্সবে এবার এককভাবে “দি মাদার” নামের আট মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম জমা দেই। সেই উত্সবেও আমার নির্মিত চলচ্চিত্র তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে। পর পর দুইবার পুরস্কার পাওয়ার পর ফিল্ম মেকার হওয়ার স্বপ্নটা আরো চেপে বসলো।
এভাবে চলতে থাকে একের পর এক ফিল্ম। চতুর্থ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্রের সময় এসএসসি পরীক্ষা থাকায় ফিল্ম জমা দেয়া হয় নি। কিন্তু আমি এ প্লাস নামের একটি ফিল্মে লিড চরিত্রে অভিনয় করি। আমার অভিনয়ের সুবাদে ফিল্মটি চতুর্থ ফেস্টিভ্যালে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত হয়।

এদিকে প্রায় দুই বছর ধরে নানা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রায় সবগুলো পত্রিকায় আমাদের টিমের রির্পোট ছাপা হতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে এমএমসি বন্ধ হয়ে যায়। এমএমসি বন্ধ হতে না হতেই শুরু হয় অন লাইন টিভি ডুগডুগির। সেখানে কাজ শুরু করি। চারটা নিউজ ও একটা টক শোর কাজ শেষ করার পর পরই ডুগডুগি টিভিও বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে সাংবাদিকতার সকল কার্যক্রমের ইতি ঘটে।

শুরু হয় শুধুই ফিল্ম নিয়ে কাজ। ছোটখাট ফেস্টিভ্যাল ও প্রতিযোগিতা মিলে প্রায় ১৩ টি চলচ্চিত্রের কাজ সম্পন্ন করি। চলচ্চিত্রে ধারাবাহিক সফলতার কারনে পঞ্চম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে পাঁচ সদস্যের একটি জুরি বোর্ডের ১জন জুরি মনোনীত হই। আমাদের বিচারকার্যের উপর ভিত্তি করেই পাঁচজন সেরা চলচ্চিত্রকার কে পুরস্কৃত করা হয়। ষষ্ঠ আন্তর্জাতিকেও আমার “হাম্বা” নামের চলচ্চিত্রটি বেশ প্রসংশিত হয়।

কিছুদিন আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় কক্সবাজারে সাতদিনব্যাপী একটি ওয়ার্কশপ হয়। সেখানে ২০ জন পুরস্কারপ্রাপ্ত সেরা চলচ্চিত্রকারদের নিয়ে একটি দুর্দান্ত কর্মশালার আয়োজন হয়। ঐ কর্মশালায় “গোলকধাঁধা” নামের ১০ মিনিটের একটি ফিল্ম আমরা পাঁচজনের একটা টিম মিলে তৈরি করি।

এভাবে একের পর এক ফিল্ম তৈরির মাধ্যমে নিজেকে একটা শক্ত পজিশনে দাঁড় করাচ্ছি। ফিল্ম মেকার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশের ফিল্ম জগতে একটি বিপ্লব ঘটানোর জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করি, দেশের জন্য দেশের ফিল্মের জন্য বড় কিছু করতে পারবো। দেশকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাব।

আপাতত ফিল্মের পাশাপাশি এইচএসসি এর এই ফ্রি টাইমটাকে কাজে লাগাতে একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছি। আর প্রথম আলোর সাপলিমেন্ট “কিশোর আলো” তে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছি। ভার্সিটি এডমিশনের পর পরই “Back to School life” নামে একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি বানাবো বলে আশা করছি।

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?