স্বপ্নের পথে নিরন্তর ছুটে চলা

Mohammad Zamsedur Rahman

Mohammad Zamsedur Rahmanছোটকাল থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আমার ছিল দারুণ আকর্ষণ। যতদূর মনে পড়ে, সেই আকর্ষণের শুরুটা হয়েছিল কার্টুন দ্বারা। এরপর সময়ের সাথে সাথে সব ধরনের চলচ্চিত্রের প্রতিই ভালো লাগা তৈরী হয়। দর্শক হিসেবেও আমি খুব একটা খারাপ না। যখনই নতুন কোন চলচ্চিত্র বেরিয়েছে, ঠিক তখনই সেই চলচ্চিত্রটি দেখেছি। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি আমার যে ভালো লাগা ও আগ্রহ তাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালে। সে বছরে আমি ‘হট্টগোল’ নামের এক কিশোর পত্রিকায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ‘চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি’ সম্পর্কে জানতে পারি। তারা প্রতি বছর শিশু-কিশোরদের জন্য এক বিশাল উৎসবের আয়োজন করে। তাও আবার যেমন তেমন উৎসব নয়, চলচ্চিত্র উৎসব। সেই উৎসবে শিশু-কিশোরেরাই চলচ্চিত্র বানায়! এমন একটা সংবাদ আমার ভেতরে এক ভাবনার সৃষ্টি করল। চলচ্চিত্রকে ঘিরে আমার যে ভাবনা-চিন্তা তাকে আরও একটু বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করলাম। সংকল্প করলাম, চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পাঠাবো। তবে সহসাই কিছু করা হয়ে উঠলো না। মফস্বল শহরে আমার বেড়ে ওঠা। সেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে প্রতিবন্ধকতা আর সুযোগের অভাব, সেটি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তাই একটু একটু করে এগুনোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি’র পূর্ববর্তী চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে খোঁজ নিলাম। জানতে থাকলাম কী কী আয়োজন থাকে, কীভাবে উৎসবে অংশ নিতে হয়। কোন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া যাবে সেসব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করলাম। এমনকি উৎসবে পুরস্কারপ্রাপ্ত বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ইন্টারনেট ঘেঁটে সংগ্রহ করে সেগুলো দেখলাম। সৃজনশীল আর মৌলিক গল্প নিয়ে কিশোর-কিশোরীরা শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। আমিও নিজে কিছু করার চেষ্টা শুরু করলাম। ২০০৯ সালেই ‘ঘরকুনো’ নামে জীবনের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। কিন্তু সেটিকে কোথাও পাঠাইনি। কেননা তখন বুঝতে পারতাম আমার আরও অনেক সময়ের দরকার নিজেকে প্রস্তুত করতে। এরপর ২০১০ সালে নির্মাণ করি ‘বন্ধু’, ২০১১ সালে ‘হঠাৎ একদিন’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে এক সময় শিশুতোষ একটা ছোটগল্প তৈরী করি। সিদ্ধান্ত নেই সেই গল্পটিকেই চলচ্চিত্রে রূপান্তর করে পরবর্তী চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠাবো। ২০১২ সালের শেষের দিকে খুব কাছের কিছু বন্ধু-বান্ধব আর স্কুলপড়ুয়া কতক ছোট ভাইদেরকে নিয়ে লেগে পড়ি নতুন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে। চলচ্চিত্রের নাম দেই ‘স্বপ্ন পূরণের গল্প’।

Mohammad Zamsedur Rahman with Nina Jones_CFS & BC Workshopরাজবাড়ি জেলা শহরের মতন মফস্বল শহরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব কঠিন বিষয়! তার উপর অভিজ্ঞতার স্বল্পতা। অনেক কিছুই জানি না, বুঝি না। তবুও মনের ভেতর অগাধ বিশ্বাস আর দারুণ আগ্রহ, উৎসবের জন্য চলচ্চিত্র বানাবো। এই সংকল্প নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা কতক ছেলেমেয়ে। রাজবাড়ির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শ্যুটিং করি, নিজেরাই সবকিছু। কেউ অভিনেতা, কেউ ক্যামেরা চালাই, কেউ সবকিছু ঠিক-ঠাক কিনা দেখাশোনা করি ইত্যাদি। আমি নিজের গল্পটাকে কোনমতে চিত্রনাট্যের রূপ দিয়ে কাছের এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা ৩ দিনের জন্য ধার করি শ্যুটিং এর জন্য। ঈদের জমানো টাকা দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আনুষাঙ্গিক খরচ বহন করি। তারপর শ্যুটিং শেষ করে নিজেই নিজের কম্পিউটারে বসে চলচ্চিত্রের সম্পাদনার কাজ করি। ফলাফল এই, খুব কাঁচা হাতের কাজ হয়ে দাঁড়ায় ‘স্বপ্ন পূরণের গল্প’ চলচ্চিত্রটি। কিন্তু সেদিকে আমাদের কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। কাঁচা কাজ তো কি হয়েছে, চলচ্চিত্র তো নির্মাণ করা গেছে! এই ভেবেই আমরা সকলে খুশি। এর ওর কাছে গল্প করে বেড়াই, কাছের দূরের সবাইকে ধরে চলচ্চিত্রটি দেখাই। মতামত নিই। আর আশ্চর্য হই যখন সকলে প্রশংসা করে। ভাবলাম, বেশ তো। চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর আগেই কিছু প্রশংসা কুড়ানো গেল। কিন্তু তবুও মনের ভেতর বিশাল ভয়, চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলাম, শেষতক নির্বাচিত হবে তো?

উৎসবের সকল নিয়ম-কানুন মেনে অবশেষে ‘স্বপ্ন পূরণের গল্প’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি পাঠিয়ে দিলাম ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ ২০১৩ তে। অধীর অপেক্ষায় থাকলাম ফলাফল কি দাঁড়ায় তা জানার জন্য। তারপর কি আশ্চর্য! আমাদের সকলের পরিশ্রম সার্থক করে চলচ্চিত্রটি উৎসবে প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়ে গেল। সারাদেশব্যাপী শত শত চলচ্চিত্রের মাঝে প্রতিযোগিতা করে আমার চলচ্চিত্রটি উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে। আমারটি সহ মোট ৬০টি চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় প্রদর্শনীর জন্য। চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি থেকে উৎসবে যোগ দেবার আমন্ত্রণ পাই। আনন্দ আর অনেক আশা নিয়ে ছুটে চলি ঢাকায়, উৎসবে। জীবনের প্রথম কোন চলচ্চিত্র উৎসবে যাচ্ছি, সেই আনন্দের অনুভূতিটাই একেবারে আলাদা। সাতদিনের উৎসবে থাকলাম মাত্র চারদিন। অনেক অনেক মজা করলাম সেই চারদিনে। দেখলাম, শিখলাম অনেক কিছু। প্রচুর চলচ্চিত্র দেখেছি, কানাডিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা ন্যান্সি ট্রিটস্ বটকিন ও মার্ক শেকটার এর সান্নিধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ কর্মশালায় অংশ গ্রহণ করেছি, সেমিনারে যোগ দিয়েছি, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সকল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি। মনে হচ্ছিল আমি যেন স্বপ্নের ভেতরে আছি। আসলে চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির চলচ্চিত্র উৎসব কোন স্বপ্নের চাইতে কোন অংশে কম নয়। শত শত ইচ্ছে পূরণ কেবলমাত্র সেখানেই সম্ভব।

উৎসবের ষোলোআনা আনন্দ অবশ্য উপভোগ করতে পারিনি আমি। কেননা এসএসসি পরীক্ষা ছিল সামনে। তাই মাত্র চারদিন থেকেই চলে আসতে হয়েছে নিজ শহরে। তবে ঢাকায় থেকে যতটুকু পেয়েছি তা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বিশেষ করে বারবার কেবল চোখের সামনে সেই স্মৃতিটুকু ভাসছিল যখন আমার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হচ্ছিল আর দর্শক সারিতে সকলের করতালির আওয়াজ পুরো অডিটরিয়ামে শোনা যাচ্ছিল। গর্বে আর এক অদ্ভূত ভালো লাগায় সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। অনেকের কাছ থেকে শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন পেয়েছিলাম। যা আমাকে পরবর্তীতে আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এরপর উৎসবের শেষ দিনে রাজবাড়িতে বসে যখন জানতে পারলাম আমার চলচ্চিত্রটি উৎসব থেকে ‘স্পেশাল এওয়ার্ড’ অর্জন করেছে তখন আনন্দে চোখে পানি চলে এসেছিল আমার। পরিবার বন্ধু-বান্ধব সকলদের সাথে অনেক আনন্দ করেছি, উদযাপন করেছি আমাদের এই বিশাল প্রাপ্তিটাকে।

চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি থেকে আমার এই অর্জনটাই যেন আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। একটা নতুন লক্ষ্য এনে দিয়েছে আমাকে। উৎসব থেকে প্রাপ্ত এই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগুতে থাকলাম। আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র বানালাম দেশের অন্যান্য চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য। সেগুলোর মাঝে তারেক মাসুদ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা দশে আমার চলচ্চিত্র ‘নীল আকাশে লাল ঘুড়ি’ নির্বাচিত হবার ঘটনাটি বেশ স্মরণীয়। এরপর চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের আয়োজনে সাতদিনের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ কর্মশালা করার সুযোগ পাই যেখানে বাইরের দেশের দুজন প্রশিক্ষক ড্যানিয়েল স্মিথ ও নিনা জোন্সের তত্ত্ববধায়নে আমরা বিশজন নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা কাজ শেখার সুযোগ পাই। আসলে আমার এই চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠার পেছনে চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির অবদান অনেক। তারা যদি আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের মত প্ল্যাটফর্ম না তৈরী করতো তবে বাংলাদেশে নবীন ও কিশোর চলচ্চিত্র নির্মাতারা সহসাই তৈরী হত না।

আগামী বছর আবারও চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির চলচ্চিত্র উৎসব আসর বসবে, সাতদিনের বর্ণাঢ্য নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হবে শিশু-কিশোরদের চলচ্চিত্র উৎসব। সারাদেশ থেকে শত শত ছেলেমেয়ে আসবে উৎসবে। অনেকেই চলচ্চিত্র বানিয়ে উৎসবে যোগ দেবে। সেই আনন্দঘন মুহূর্তের জন্য সারাটা বছর অপেক্ষায় প্রহর গুণি। আগামী বছরগুলোতে যেসব ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চলচ্চিত্র বানিয়ে উৎসবে আসবে তাদের জন্য অসংখ্য শুভেচ্ছা আর শুভ কামনা জানাই। আমরা যেসব প্রতিবন্ধকতার মাঝ দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি আশা করি তাদের সে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। তাদেরকে শুধু এটুকু বলতে চাই, তোমাদের সৃজনশীলতা আর মেধা কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের চলচ্চিত্রকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই প্রত্যাশা থাকবে। তোমাদের পাশে চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি থাকবে। থাকব আমিও, তোমাদের শুভাকাঙ্খী হয়ে। আর সবশেষে চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটিকে জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। সাথে ছিলাম, আছি এবং আগামীতেও থাকব।

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?