সিএফএস, আমরা ও আমি

Fariha Jahan

Fariha Jahan“একটুও মন খারাপ কোরো না, হাফসা।“
“যারা পুরস্কার পেয়েছে তাদের নাম আগে বলব না ফিল্মের নাম আগে বলব?”
“দেখ, যারা পুরস্কার পায়নি, তারাও কত মজা করছে, আর তুমি কত সুন্দর অভিনয় করেছ………”
“প্রথম হয়েছে ‘টুকটুকের চশমা!!!”

কীমাশ্চর্যপরমঃ!!!!!!!!!

একদিকে গ্যালারিতে বসে রোদোশী, আমি আর আমাদের ‘টুকটুক’ হাফসা। আর অন্যদিকে মঞ্চে জাফর ইকবাল স্যার তৃতীয় উৎসবের প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণা করলেন!!! জীবনের অল্প কিছু আনন্দময় মূহুর্তগুলোর একটা!

এই যে ‘কিছু আনন্দময় মূহুর্ত’-এর কথা বললাম তার বেশিভাগই চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি (সিএফএস) এর কল্যাণে পাওয়া। প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণও সিএফএস এর কারণেই। অবশ্য সিএফএস সাথে যোগাযোগ প্রথম উৎসব থেকেই। কিন্তু তৃতীয় উৎসবের স্মৃতি এতটাই সর্বগ্রাসী যে প্রথম উৎসবের কথা প্রায় মনেই পড়ে না। ৩ দিন গিয়েছিলাম, কারও সাথে কথাই বলতে পারিনি। পুরোটা সময় একা একা কাটিয়েছিলাম। এই দুঃখ কেটে গিয়েছে তৃতীয় উৎসবে।

তৃতীয় উৎসবের আগে পত্রিকা ব্যাগে নিয়ে ঘুরে বেড়াই আর মানুষকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করি, ‘মুভি বানাবে?’ কেউই সাড়া দেয় না। কোচিং এও একই কাজ করি। অবশেষে…! আমার দেখা সবচেয়ে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত মানুষটার সাথে পরিচয় হয়! রোদোশীইইইইইই! ও নিজে থেকেই কথা বলতে আসে। ওর আগ্রহ দেখে আমিও অবাক হই। এরপর কিছুদিন আমরা যে কী করেছি সেটা বুঝেই উঠতে পারিনি। কোন কিছুই মাথায় আসছিল না। এরপর মনে হল অনেক ছোটবেলায় পড়া একটা গল্প। ব্যস, আর কী চাই!

হ্যাঁ, আরও অনেক কিছুই চাই। ক্যামেরা চাই, অভিনেতা-অভিনেত্রী চাই, ইচ্ছামত শুটিং করার জায়গা চাই, আর চাই ‘টুকটুক’ চরিত্রের জন্য একজন দারুণ পিচকি! এক এক করে সবই যোগাড় হল। শুটিং এর প্রথম দিনই সমস্যার উপর সমস্যা। একজন অসুস্থ, একজন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেবে তাই বেশি সময় দিতে পারবে না, আরেকজনের চিৎকারে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়! এই চিৎকার সম্পাদনার কাঁচি চালিয়েও মুছে ফেলা যায়নি। শিডিউল মেলে না টুকটুক, তার মা আর এক ঝাঁক পিচ্চির! তবুও এক এক করে দিন যায়, শুটিং শেষ হয়। এইবার সম্পাদনার পালা। এক ছবি তোলার স্টুডিওতে যাই। তারা এক কথায় না করে দিল।

তাই শাওন মামার শরণাপন্ন হই। এখন মনে হয় ভাগ্যিস স্টুডিও থেকে না করেছিল! মামার বাসায় যাই আর মামার রসিকতায় রীতিমত চোখের জল, নাকের জল এক করে বাসায় ফিরি। কিন্তু মামা না থাকলে কখনই দীর্ঘ সময় নিয়ে ধৈর্য্য ধরে এই সম্পাদনা, দারুণ আবহ সংগীত সম্ভব হত না।

মুভি জমা দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। আমাদের আনন্দে ভাসিয়ে দিয়ে আমন্ত্রণপত্র আসে। উৎসবের যোগ দেই। কী অসাধারণ সাতটি দিন! আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম কারণ প্রদর্শনীর আগেই মোরশেদুল ইসলাম স্যারও ‘টুকটুকের চশমা’ দেখেছিলেন এবং আমাদের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘খুব ভাল হয়েছে’!

শেষের দিনের কথা শুরুতেই বলেছি। তাই আর যাচ্ছি না সেই বর্ণনায়। আবার ফিরি পঞ্চম উৎসবে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। খুব ভাল লাগে। এই প্রথম বড় কোন কাজের সাথে যুক্ত হবার আনন্দ অনুভব করি, একসাথে কাজ করার মজা উপভোগ করি। মোরশেদুল ইসলাম স্যার, মুন্নী খালা ধরে ধরে কাজ শিখিয়ে দেন, তাই বড় কাজের দায়িত্ব নেয়া শিখতে থাকি। শুধু বাদ পড়ে যাই একটি জায়গায়। দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্র বানানোর সাহস করে উঠতে পারি না নানা কারণে। আবারো সিএফএস সেই সুযোগটা করে দেয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল, সিএফএস মিলে একটা কর্মশালা হয় কক্সবাজারে এবং ৪ জন গুণী পরিচালকের গ্রুপের একজন সদস্য হয়ে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ! আবারো আনন্দময় কিছু মূহুর্ত! একই সাথে জীবনের সবচেয়ে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা এবং নিরুপায় হয়ে খালার আদেশে ঢেঁকি তো ঢেঁকি, পুরো মারমেইড রিসোর্ট-ই গিলে ফেললাম আর সারা জীবনের জন্য অন্যদের হাতে নির্মম রসিকতার রসদ তুলে দিলাম!

সিএফএস প্রতি বছর উৎসবের শেষ হয় আর আমি সিএফএস নিয়ে মত্ত হয়ে থাকি। এতটাই মত্ত হই যে ক্যাম্পাসে আমার চোখ সিএফএস এর ব্যাগ খুঁজে বেড়ায়। দূর থেকে সিএফএস- এর ব্যাগ দেখলেও চিলের মত উড়ে যাই ‘এইটা কে, এইটা কে’ করতে করতে। একবার একজনকে পাওয়া গেল যে বলে বসল, “আমি তো অরগানাজার ছিলাম”। আকাশ পাতাল ভাবতে থাকি, কই একে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না, ইস্, এখনও অরগানাজারদের সবাইকেই চিনে উঠতে পারিনি! অবশেষে সে স্বীকার করে যে ব্যাগটা সে কোন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পেয়েছে!

কেন সিএফএস কে এত ভালবাসি, কেন এখানকার মানুষগুলোর প্রতি এত ভালবাসা কাজ করে, কেন প্রতি বছর এই সাত দিনের জন্য অপেক্ষা সেটা বলে প্রকাশ করা কঠিন। ভালবাসার কারণেই সিএফএস থেকে পাওয়া সবকিছু জমিয়ে রাখি। এমনকি সেমিনারের খুঁটিনাটি লেখা কাগজ থেকে শুরু করে প্রথম উৎসবে এ পাওয়া কলমটিও। পঞ্চম উৎসবে সেমিনার এর দিন দুপুরে খাবার সময় পাইনি। বিকেলে খালা শুনেই স্যারকে বললেন। স্যার পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে খেয়ে নিতে। আমি সেই নোটটিও অতীব যত্নের সাথে রক্ষা করেছি!

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?