সিএফএসেই বেড়ে ওঠা

Hemanta Sadeeq

Hemanta Sadeeqআমি বেড়ে উঠেছি ‘নেই’ এর ভেতর। কিন্তু মজার বিষয় হলো, কখনোই আমি কোনকিছুর অভাব বোধ করিনি। কারণ আমার পরিচিতি জগতের বাইরে যে আরো কত বড় একটা পৃথিবী আছে, আরো কতকিছু পাবার অধিকার আমি রাখি, তা জানতামই না। আর যেহেতু আমার কী নেই তা-ই জানি না, খারাপ লাগার তো প্রশ্নই আসে না। তখন যেন সব পেয়েছির দেশেই ছিলাম!

খারাপ হয়ে যাব-এই অজুহাতে কোন ছেলেমেয়ের সাথেই মিশতে দেননি অভিভাবক। আমার জগৎ তাই ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সংকীর্ণ। একাই থাকতাম। একটু বড় হবার পরই তাঁরা আমাকে ভালো আর সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ধর্মীয় শিক্ষালয়ে পাঠিয়েছেন । পুরোটা শৈশব ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েই কেটেছে। পড়াশোনার অবসরে ধর্মীয় বই ঘেঁটে ঘেঁটে খুঁজে ফিরেছি কোন কাজে অধিক পূণ্য, কী আমল বেশি বেশি করলে জান্নাতলাভ হয়। আমার স্বপাওয়া, চাওয়া ওর ভেতরেই ছিল। এর বাইরে কিছু জানতামও না, ভাবতামও না।

কিন্তু পূণ্যের খোঁজে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে যে পাঠাভ্যাস গড়ে উঠেছিল, তা-ই আমাকে হঠাৎ নিয়ে গেল ভিন্ন এক মোহনায়। এক ঈদের ছুটিতে নানাবাড়ি গিয়ে দেখি ওখানের স্থানীয় ক্লাবের ছেলেদের উদ্যোগে, সরকারি অনুদানে গড়ে উঠেছে বড়সড় একটা পাঠাগার। কত নামের, কত রঙ্গের, কত বিচিত্র বই সে পাঠাগারে! মামা ক্লাবের নীতিনির্ধারকদের অন্যতম হওয়ায় অবাধ প্রবেশাধিকার পেলাম ওখানে। পরিচয় ঘটলো সত্যজিৎ, হুমায়ূন, জাফর ইকবাল, আলী ইমাম, সুকুমারের সাথে। গোগ্রাসে গিলতে থাকি একটার পর একটা বই, আর আমার মেঘাচ্ছন্ন চিন্তার আকাশ পেতে থাকে একটু একটু করে রোদ্দুর।

সাতদিনের ওই ছুটি শেষে যখন আবার ফিরে যাচ্ছি আমার পুরোনো জীবনে, তখন আমি এক নতুন মানুষ। আমার চিন্তার জগতে যে মহাবিপ্লব ঘটে গেছে, তা আর হজম করতে পারলাম না। শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়লো জীবনের। যে নিশ্চিন্ত-নির্বিঘ্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলাম, তা হারিয়ে গেলো। নতুন ভাবনা, নতুন স্বপাওয়া জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করলো, তাড়িয়ে নিতে থাকলো।

পরিবারের সবাই আমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না জেনেই যেহেতু নতুন পথ চলা শুরু করেছি, অনেকের ভিন্নমত তাই টলাতে পারলো না। গেলাম রাজশাহীতে। খুলে গেলো আরো অনেকগুলো দরজা আমার সামনে। বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইয়ের গাড়ি দায়িত্ব নিলো পুরো পৃথিবীটাকে চেনানোর। পরিচয় করালো রবীন্দ্রনাথ (আমার দুর্ভাগ্য, অনেক পরে এই মহীরুহ এলেন আমার কাছাকাছি) হুমায়ুন আজাদ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের সাথে।

এছাড়া খোঁজ পেলাম বিভিন্ন প্রতিযোগিতার। শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সরকরি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করলাম। নিজেকে প্রমাণ করবার এতবড় মঞ্চ আগে কখনো পাইনি। আবিষ্কার করতে শুরু করলাম আমার অপূর্ণতাগুলো, তাই নিজেকে প্রস্তুত করবার তাড়নাও অনুভুত হলো প্রবলভাবে। পরাজয় আরো দৃঢ়চেতা করলো আমাকে, জয় দেখালো স্বপ্ন।

আবৃত্তি, সঙ্গীত, অভিনয়, সাধারণ জ্ঞান, গল্পবলা-গল্পলেখা, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তব্য, রচনা প্রতিযোগিতার স্মারক-সনদ যখন আমার ব্যক্তিগত ফাইল ক্রমশ: পরিপূর্ণ করে তুলতে থাকলো, অদ্ভুত বিষয়; আমার পরিতৃপ্তি এলো না। বরং ক্রমাগত বাড়তে থাকলো তৃষ্ণা। নানা স্বপ্ন উঁকি দিয়ে দিয়ে গেল মনের খোলা জানালায়। ভেবে কষ্ট হয়, আমার পুরোটা শৈশব বন্ধ ছিল মনের জানালাটি।

২০০৭ সাল। তখন আমি পুরোপুরি বুঁদ হয়ে আছি বইয়ের বৈচিত্র্যময় জগতে, প্রতিযোগিতার মে । পত্রিকায় একদিন নতুন একটি রচনা প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বিষয় ‘তোমার দেখা প্রিয় চলচ্চিত্র’। আমি তো সেই অর্থে চলচ্চিত্রই দেখি নি। ছেলেবেলায় দেখা একটি চলচ্চিত্রের কথা আবছা মনে পড়ে। ওটার যেটুকু গল্প মনে ছিলো, তা বন্ধুদের বললাম। একজন বললো, ছবিটার নাম দীপু নাম্বার টু। তখন মনে পড়লো ওই নামের একটা বই আমি দেখেছি, পড়া হয়ে ওঠেনি। বইটা পেয়ে গেলাম বন্ধু রায়হানের কাছে। ওই বই আর ছেলেবেলায় দেখা ছবিটির যেটুকু অংশ মনে ছিল তাকে আশ্রয় করেই বসে গেলাম লিখতে।

২০০৮ সাল, জানুয়ারির মাঝামাঝি। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় চমক নিয়ে উপস্থিত হলো ১ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন কমিটির পক্ষ থেকে একটি চিঠি। সাতদিনব্যাপি অনুষ্ঠেয় ওই উৎসবে আমাকে আমণন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আনন্দে রীতিমত পাগল হবার জোগাড় আমার। ঢাকায় যাবো!
ফ্রেমে ফ্রেমে আগামী স্বপ্ন দেখানোর ওই উৎসবে যা পেলাম, তার আশা স্বপ্নেও করিনি কখনো। অতটা স্বপ্নবিলাসী ছিলাম না। জাফর ইকবালের সাথে দেখা হবে, তাঁর সাথে আড্ডা দেবো এটি চিন্তা করা আমার জন্য তো ভয়াবহ অন্যায় ছিলো! কিন্তু এমন অনেক অন্যায় আমি না করলেও সত্যি সত্যি ঘটলো। একান্তে আড্ডা দিলাম মুস্তাফা মনোয়ার, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেলসহ অনেক স্বপ্নপুরুষের সাথে।

দেখার সুযোগ হলো আমাদের দেশের দীপু নাম্বার টু, এমিলের গোয়েন্দাবাহিনী, দূরত্ব; প্রতিবেশী ভারতের গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, সোনার কেল্লাসহ অনেক বাংলা ছবি। এর বাইরেও জার্মানির ছবি, ইরানী, বৃটিশ, হলিউডি, কানাডিয়ান-কত ভাষার, কত বিষয়ের, কত স্বাদের ছবি যে দেখলাম! একেকটি ছবি দেখি আর অভিভূত হতে থাকি। সেই প্রথম জানলাম দুনিয়াজুড়ে শিশুদের জন্য কতকিছু করা হয়; শৈশবের সময়টাকে রঙ্গীন করার জন্য কত আয়োজনই না থাকে!

এই উৎসবটি আমার ভেতর নতুন প্রাণ সঞ্চার করলো । আমার বর্ণহীন ধূসর পৃথিবী ধীরে ধীরে ঝলমলে রঙ্গীন হয়ে উঠল। দিনভর ছবি দেখা, কীর্তিমানদের সাথে কথা বলা, খাওয়া, ঘুরে বেড়ানো- সত্যিকার অর্থেই সে যেন এক স্বপ্নপুরী!

তবে ঐ আনন্দের বন্যায় ভাসতে ভাসতে শুধু একটি বিষয়ই বারবার মনে হয়েছে, আমার বন্ধুরা এই মানুষগুলোর সাথে কথা বলার, এই অসাধারণ ছবিগুলো দেখার সুযোগ পেল না। পরে উৎসব কর্তৃপক্ষ যখন জানালেন আমরা নিজেদের শহরেও এই আয়োজন করতে পারি, তাঁরা সহযোগিতা করবেন- তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি এই আয়োজন করবো রাজশাহীতে।

উৎসব শেষে ফিরেই বন্ধুদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি এ বিষয়েও আলাপ করলাম। ভেতরে ভেতরে উৎসব আয়োজনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকলাম নিজেদের। নতুন স্বপ্নে-ভাবনায়-প্রস্তুতিতে কাটতে থাকলো ভিন্নরকম সময়।

Hemanta Sadeeqপরের বছর রচনার পাশাপাশি উৎসবের জন্য শিশুদের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতার কথা জানলাম পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে। যুক্ত হলো নতুন ভাবনা। খুব বেশিকিছু চিন্তা না করেই ঠিক করলাম, ছবি বানাবো। আমার সিদ্ধান্তের কথা জেনে হাসলো সবাই। থামলাম না আমি। খুব কাছের বন্ধুরা, বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া রফিক মুয়াজ্জিন, রাব্বানী, হাসান, সুমীর মতো ক’জন অগ্রজের অণুপ্রেরণায় নেমে পড়লাম। আমার পুরনো একটা গল্পের চিত্রনাট্য করে দিলেন রফিক মুয়াজ্জিন। সবার চাঁদায়, উৎসাহে, সহযোগিতায় অবশেষে নির্মিত হলো আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্বপ্নভঙ্গের গল্প’।

স্বপ্নের উৎসবে ‘স্বপ্নভঙ্গের গল্প’ মনোনীত হলো। আমার চোখে নতুন স্বপ্ন দেয়া আমার প্রিয় উৎসবে প্রদর্শিত হলো আমারই নির্মিত ছবি, আর যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে উৎসবের খবর পেয়েছি, তাতে আমার ছবি নিয়ে সংবাদ বেরুলো, আমার অনুভুতি ছাপা হলো!

আমার সাহস, স্বপ্ন বেড়ে গেলো বহুগুণ।

দ্বিতীয় উৎসবে অংশ নিয়ে আরো বেশি তাড়না অনুভব করলাম নিজের শহরে অমন একটা উৎসব আয়োজনের। ‘স্বপ্নভঙ্গের গল্প’ নির্মাণের সুত্রে যে মানুষগুলোর সাথে পরিচয় ঘটেছে, ফিরেই তাঁদের সবার সাথে আলাপ করলাম। শুরু করলাম প্রস্তুতি।

২০০৯ সাল। আমরা চার-পাঁচজন কিশোর আর কয়েকজন প্রাণচঞ্চল তরুন নানা সীমবদ্ধতা সাথে নিয়ে রাজশাহীতে আয়োজন করলাম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের। আমাদের উৎসাহিত করতে উৎসবে স্বয়ং উপস্থিত থাকলেন মোরশেদুল ইসলাম। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এলো ছবি দেখতে। প্রদর্শনী শেষে ওরা যখন চোখে-মুখে অন্যরকম মুগ্ধতা নিয়ে বের হচ্ছিলো, আনন্দে আমার ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কাঁদি!

এরপর প্রতিবছর নির্মাণ করতে থাকলাম নতুন নতুন ছবি, অংশ নিতে থাকলাম ঢাকার মূল উৎসবে। রাজশাহীর আয়োজনও থেমে থাকলো না। আমরা চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির রাজশাহী শাখার উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণ কর্মশালা, সেমিনার আয়োজনসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট নানা আয়োজন ধারাবাহিকভাবে করতে থাকলাম।

২০১১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপটে নির্মিত আমার ছবি সীমান্তের খোঁজে চতুর্থ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেল। রাজশাহীতে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমিই প্রথম কোন আন্তর্জাতিক উৎসবের পুরস্কার নিয়ে যাওয়ায় সবার অভিনন্দনে-আশীর্বাদে সিক্ত হই। সিটি মেয়র ‘সীমান্তের খোঁজে’র পুরো পরিবারকে অভিনন্দন জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দেন। খুব ভালো লাগে, কিন্তু আমার তৃপ্তি আসে না। আরো ভালো কিছু করবার প্রবল ইচ্ছে তাড়িয়ে বেড়ায়।

২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আরেকটি স্বপ্ন পায় পূর্ণতা। এখন সবটুকু স্বপ্ন কেবলই চলচ্চিত্রকে ঘিরে। এ পর্যন্ত সাতটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি, যেগুলোর কোনটিই স্রষ্টা হিসেবে আমাকে পূর্ণ আনন্দ দিতে পারেনি । সবসময় সেই আনন্দের, পরিতৃপ্তির সন্ধানেই ছুটতে চাই-প্রয়োজনে পুরোটা জীবন।

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?