আমার সিএফএস

Riddha Aninda

Riddha Aninda২০০৬ সাল। আমার বয়স তখন ৯। আমাদের আবৃত্তির ক্লাসে এক বড় আপু মোরশেদুল ইসলামের একটা নাটকে কাজ করার সুযোগ পেলো। নাটকের নাম ‘ভুতের বাচ্চা সোলেমান’। আমরা সবাই দারুন এক্সাইটেড। এরই মধ্যে আপু একদিন কয়েকটা কার্ড এনে আমাদের সবাইকে দিলো। একটা ফিল্ম শো’র আমন্ত্রণ পত্র। শিশুতোশ চলচ্চিত্র দেখানো হবে বলে আমি বাবা মায়ের সাথে খুব আগ্রহ নিয়ে জার্মান কালচারাল সেন্টারে ছবি দেখতে গেলাম। ছবিটার নাম ছিলো ‘নট ওয়ান লেস’, চাইনিজ ছবি। দেখেই তাক লেগে গেলো। এত সুন্দর সিনেমা হতে পারে! সিনেমা দেখা শেষে আমাদের নাম ঠিকানা লিখে নেওয়া হল। এবং আমি ‘চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য হোলাম।

কিছুদিনের মধ্যেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো। আমাদের বাসায় আমার নামে একটা চিঠি আসলো। আমার জীবনে পাওয়া প্রথম চিঠি! খাম খুলে জানা গেল চিঠি এসেছে সিএফএস থেকে, তারা আবার ফিল্ম শো করছে। আমি আবারো ছুটে গেলাম ছবি দেখতে। এরকমভাবে চলতে থাকলো বছরখানেক এবং আমি আস্তে আস্তে সিএফএস’এর প্রেমে পড়ে গেলাম! একদিন ছবি দেখা শেষে ঘোষণা আসলো, একটা ফিল্ম ফেস্টিভাল হবে। এলিফ্যান্ট রোডে একটা ঠিকানা দেওয়া হলো, আমরা যারা ভলেন্টিয়ার হতে চাই তারা যেন যোগাযোগ করি।

নির্ধারিত দিনে মায়ের হাত ধরে আমি এলিফ্যান্ট রোডে হাজির। যেতে একটু দেরি হয়েছিল। ভেতরে গিয়ে দেখলাম একটা রুমের মধ্যে গাদাগাদি করে ফ্লোরে বসে আছে প্রায় একশ বাচ্চা-কাচ্চা। আমি ঢোকার সাথে সাথেই মুন্নি আন্টি বললেন, “এইটাই শেষ বাচ্চা। আর কাউকে আমরা নিবো না।‘’ এবং সম্ভবত ওটাই ছিলো আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট!

ফেস্টিভাল পূর্ববর্তী আমার কাজ বলতে ছিল একগাদা আইডি কার্ডে ফেভিস্টিক দিয়ে স্ট্যাম্প সাইজের ছবি লাগানো। খুব মজায় কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু তখন জানতাম না যে মজা এখনো অনেক বাকি!

অনেকগুলো মিটিং এবং অনেক জল্পনা কল্পনার পরে পর্দা উঠল ‘১ম আর্ন্তজাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব’-এর। প্রথম ফেস্টিভালে আমার দায়িত্ব ছিল সেলস স্টলে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সাতটা দিন আমি কাটালাম। শেষদিনে খুব কাঁদলাম। এক অসাধারণ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলাম সিএফএস’এর সাথে। যা কোনদিনও ছুটবে না!

২য় ফেস্টিভালের প্রথম মিটিংএ মোরশেদ আঙ্কেল আমাকে জানালেন এবারের ফেস্টিভালে শিশু নির্মাতাদের জন্য প্রতিযোগীতা রাখা হবে। জুরিরাও হবে শিশু, এবং আমাকে একজন জুরি হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। ব্যাপারটা আমার কিছুই মাথায় ঢুকলো না এবং বের হওয়ার পরে আমি মাকে সংবাদটা দিলাম। মায়ের উচ্ছাস দেখে প্রথম কিছুটা বোধগম্য হল যে দারুন কিছু ঘটে গেছে। আগের ফেস্টিভালে আমি ছিলাম একটা শো-পিস টাইপের জিনিস। মানুষ এসে দেখতো এখানে বাচ্চারা কাজ করে। আমাদের সাথে কথা বলত। আর আমরা সারাদিন ছোটাছুটি করে বেড়াতাম। ২য় ফেস্টিভালে জুরি হয়ে আমি প্রথম সিএফএস’এ সত্যিকার অর্থে কোন কাজ করলাম। এবং কাজটা যে খুব সহজ ছিলো না তা বলাই বাহুল্য। আমাদের বিচারে পাঁচটি ছবি পুরস্কার পেলো। ক্লোজিংএর দিন আমাদের মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। পরেরদিন পেপারে আমাদের ছবি বের হল। গর্বে আমার বুক ফুলে গেলো। ২য় ফেস্টিভালটা তাই হয়ে থাকল আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয়।

এরপরের ফেস্টিভালগুলোর কাহিনি প্রায় একই রকম। প্রতিবারই অসাধারণ মজা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাদের এক একটি ফেস্টিভাল হয়ে ওঠে অসাধারণ। একটি বছরের বাঁচার, পড়াশুনা করার এনার্জি যেন আমরা পাই ফেস্টিভাল থেকে… এইবার ফেস্টিভালে থাকতে পারছি না, এসএসসি পরিক্ষা। জানি কেঁদে বুক ভাসিয়ে লাভ নেই। তবুও… মন কি মানে…?

প্রতিবারের মত জানি এবারেও অসাধারণ হবে ফেস্টিভাল। তাই খামোখা শুভকামনা জানাবো না। শুধু বলি, ৮ম ফেস্টিভালকে আমি যতটা মিস করব, আর কেউ ততটা করবে না।

সিএফএস শুধু আমার না, অনেকেরই জীবন আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে! ছোট্ট করে শুরু করা সেই সংগঠনটিই এখন শিশু চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। সিএফএস’ই তৈরী করতে পারে আবু সাইদ নিশান, সাদিয়া প্রিতি অথবা রায়হান আহমেদের মত অসাধারণ সব শিশু নির্মাতাদের! তাই গর্ব করে বলা যেতেই পারে, আমরা সবার সেরা!!

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?