আমার প্ল্যাটফর্ম

Ariful Islam Siam

Ariful Islam Siamপ্রত্যেকটা মানুষই কিছু জিনিসের উপর চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকে। যে তোমাকে স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করবে, যে তোমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে, হ্যাঁ তুমিই পারবে। তাকে অবজ্ঞা করা যায় না। সে তোমার শিক্ষক। তোমার প্ল্যাটফর্ম। আমার প্ল্যাটফর্ম সিএফএস (Children’s Film Society) কেননা ছবি বানানোর মত দুঃসাহসিক কাজ করতে প্রেরণা যোগানো চাট্টিখানি কথা না। এর চেয়ে বড় প্রেরণা শিশু-কিশোরদের আর কোন প্রতিষ্ঠান দেয় কিনা আমার জানা নেই।

যাই হোক, সিএফএস এর সাথে আমার পরিচয় ২০১২ সালের ৭ই আগস্ট। দিনটি মনে আছে, কারণ “টিন ফিল্ম ওয়ার্কশপ” নিয়ে আমি অনেক এক্সাইটেড ছিলাম। দুপুরে ওয়ার্কশপের জন্যে সিএফএস অফিসে ইন্টারভিউ দিতে যাব। সেই রকম প্রস্তুতি। যেন চাকুরীর প্রথম ভাইভা। কি পরে যাব? সকালে ঘুম থেকে উঠেই পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করে রাখি। আমার বন্ধু তুষারকেও পাঞ্জাবী পরতে বলি। তারপর দুজনে ইন্টারভিউ দিতে যাই। চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইন্টারভিউ শেষ হয়।

এবার রেজাল্ট দেয়ার পালা, ঠিক পরদিন তুষারের মোবাইলে মেসেজ আসে তুষার ইন্টারভিউতে টিকে গেছে। কিন্তু আমার মোবাইলে কনফার্মেশন মেসেজ আসে নাই। মানে, আমি সিলেক্ট হই নি। তখন নিজেকে অনেক নিঃসঙ্গ মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, পানিশূন্য কোন একটা নদীতে আমাকে ফেলে দেয়া হয়েছে, আমি সাঁতার কাটছি কিন্তু ডাঙায় উঠতে পারছি না। আমি চিৎকার করে বলছি, পানি দাও! পানি দাও!! আমি সাঁতার কাটব। কিন্তু কেউ আমাকে উদ্ধার করে না। যেন বড় কিছু হারানোর নিঃসঙ্গতা আমাকে ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে।

ঠিক সন্ধ্যায় হঠাৎ যখন আমার মোবাইলে মেসেজ আসে এবং আমাকে বলা হয় আপনি ওয়ার্কশপের জন্যে সিলেক্ট হয়েছেন; তখন আমার মনে হলো, আমি যেন তাহাকে পাইলাম; তখন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আসলেই আমি সিলেক্ট হয়েছি? সত্যিই আমি ফিল্ম বানাব?? যদিও ফিল্ম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়াই টিন ফিল্ম ওয়ার্কশপের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এই ওয়ার্কশপে চান্স পাওয়াই আমার কাছে ব্রিটিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার মতন আনন্দ ছিল। হয়তোবা আমার সাব কনশাস মাইন্ড আমাকে জানান দিচ্ছিল, এটাই তোমার প্ল্যাটফর্ম। একে ধরে রাখো। হুম, আমি ধরে রেখেছি।

তারপর ওয়ার্কশপ শেষে বন্ধুরা মিলে একটা প্রোডাকশন দিয়েছি। a3 প্রোডাকশন । ১৯৭১ কে নিয়ে একটি শর্টফিল্ম বানাই। প্রত্যাশা ছিল, ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে যাতে আমাদের ফিল্মটি সিলেক্ট হয়। আশা সীমিত কিন্তু যখন আমার প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে ৭০টি বাছাইকৃত সিনেমার মধ্যে আমাদের সিনেমা ২য় হয়ে যায়। তখন কিন্তু আশাকে সীমিত করা যায় না।। স্বপ্ন উঁকি দিয়ে বেড়ায়।

পুরস্কারের প্রায় অর্ধেক টাকা ব্যয় হয় ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে। বাকি টাকা দিয়ে ৭ম ফেস্টিভালের জন্যে আবার ২টি ফিল্ম বানাই। এই দুটি ফিল্ম বানানোর পর আমি উপলব্ধি করি, যারা আমার সিনেমা দেখবে, আমার উপস্থাপন ভঙ্গি কি তারা পছন্দ করবে? বা আমার রূচি কি তারা গ্রহণ করবে? ঠিক এইরকম একটা চ্যালেঞ্জের মুখে আমি পড়ি এবং অতঃপর আমি ৭ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পাইনি এবং অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জে হার মানিনি। কেননা প্ল্যাটফর্ম হার জিতের খেলা। আমার ফিল্ম বিচারকদের ভাল নাও লাগতে পারে কিন্তু আমার চিন্তাকে কেউ অবজ্ঞা করতে পারবে না। এইকারণেই এবারও ৮ম ফেস্টে আমি সিনেমা বানাব।

আসলে পুরস্কার পাওয়ার পরই আমার সব কিছুর ধ্যান ধারণা হয়ে যায় ছবি নিয়ে। কেন ছবি বানাব? কার জন্যে বানাব? এটা আগে জেনে নেই নিজের কাছ থেকে। উত্তর জানার পর নিজের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যাই। কাজ শুরু করেও করা হয় না। তারপর হঠাৎ, একদিন আলাদিনের দৈত্যের মত সিএফএস আমাকে ৭ দিনের এক বড় ওয়ার্কশপের সুযোগ করে দেয় কক্সবাজারে। সত্যি কথা, অনেক কিছু শিখতে পারি আমি। লাইফের বেস্ট মোমেন্ট কাটাই মারমেইড রিসোর্টে । অনেক ভাল এবং ব্রিলিয়ান্ট মানুষের সাথে পরিচয় আমার হয়েছে (রুমমেট সজীব জামান এর কথা না বললে লেখা অপূর্ণ থাকবে)। মারমেইড রিসোর্ট এর মত জায়গায় আমাদের যে মূল্যায়ন দেয়া হয়েছে তাতে রীতিমত নিজেকে সেলিব্রেটি মনে হয়েছে। আমার চিন্তার দাম আছে এবং আমি পারব – এই ধারণা আমি এই ওয়ার্কশপের মাধ্যমে পাই। আমি বিশ্বাস করি, সিনেমা বানাতে গেলে সবার আগে নিজের মননকে তৈরি করা লাগে। চিন্তা করার ক্ষমতা শেখা লাগে। এইগুলা আমি শিখেছি এই ওয়ার্কশপের এক্সপেরিয়েন্সে।

সিএফএস সম্পর্কে আর কি বলব। সিএফএস নাম মনে পড়লে সবার আগে মনে পড়ে মনন ভাইয়ার নাম। তারপর, জাফর ইকবাল স্যার এর পুরস্কার দেয়ার ঘোষনা দেয়ার মুহূর্ত। অতপর, সিএফএস ওয়ার্কশপে এফডিসির ভুনা ডালের চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাওয়ার স্মৃতি।

আর কেন জানি মনন ভাইয়াকে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই, কিন্তু ভয়টা আসে শ্রদ্ধা থেকে। উনি ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর বলে বলছি না, যারা উনার সাথে মিশে তারা জানে মনন ভাইয়া আসলেই অনেক ভাল। উনার ক্যামেরা দিয়েই আমার প্রথম ফিল্ম হয়। এই উপকার খুব কম মানুষই করে। মনন ভাইয়ার ভিতরের মনটা সেইরম পরিস্কার, কোন ফাঁক-ফোকর নাই। আরও অনেক ব্রিলিয়ান্ট মানুষের সাথে আমার এইখানে পরিচয় হয়েছে। সজীব ভাই, তৌকির, ফারিহা আপু, প্রদীপ্ত, আবীর ভাই, শুভজিত ভাই, আমীন, নিশান, মাসুদ ভাই আরও অনেকে। এদের আশে পাশে থাকলে অনেক কিছু শিখা যায়। যেমন, মনিরুজ্জামান সজীব ভাইকে আমি আমার মেন্টর মানি। আমি উনার কাছ থেকে এক অর্থে সিনেমা মিনিং বুঝেছি।

যাই হোক, আমি আমার প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেয়েছি। এখন আমার পারফর্ম করার পালা। ঠিক এই সুযোগটি করে দেয়ার জন্যে সিএফএস কে আমি অশেষ ধন্যবাদ জানাই।

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?