বিনা পয়সায় ফিল্ম

অর্ঘ গভীর মনোযোগে টিভিতে একটি সিনেমা দেখছিল। শুরু থেকে ওর মনে হচ্ছিল অনেকদিন পর একটা দেখার মতো জিনিস পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু ডিরেক্টরের মনগড়া সমাপ্তি অর্ঘের বিরক্তিতে পরিণত হয়েছে। সে বলেই বসলো, “ধুর! এটা কোন সিনেমা হল? এরচেয়ে তো আমি ভালো সিনেমা বানাতে পারবো”। ওর মা পাশ থেকে বললেন, “ওরকম সবাই বলে! বানিয়ে দেখা পারলে।” ক্লাস নাইনে পড়া অর্ঘ মায়ের কথাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিবে নাকি খেলতে যাই বলে এড়িয়ে যাবে চিন্তা করছিল। কিন্তু চিন্তা শেষ হওয়ার আগেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “হ্যাঁ, বানাবোই তো!” ওর মা খুব একটা পাত্তা না দিয়ে খবরের চ্যানেলে চলে গেলেন।

অর্ঘ ড্রয়িংরুম ছেড়ে কম্পিউটার রুমে এসেই ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি  করা শুরু করলো কীভাবে সিনেমা বানানো যায়। সারারাত জেগে স্ক্রিপ্ট লিখে পরদিন স্কুলে বন্ধু রাতুলকে বললো ওর ছবিতে অভিনয় করবে কি না। রাতুল শুরুতে গাইগুই করলেও শেষপর্যন্ত অর্ঘকে ওর সব অ্যাসাইনমেন্ট করে দিতে হবে শর্তে রাজি হল। এইরকম করে অর্ঘ আরও চার-পাঁচজন বন্ধুকে বিভিন্ন প্রলোভনীয় শর্তে রাজি করিয়ে তৈরি করে ফেললো ওর টিম। তারপর বাসায় থাকা মান্ধাতা আমলের ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে মাঠে নেমে পড়লো জীবনের প্রথম সিনেমা বানাতে। একদম শূন্য টাকায়।

না, গল্প উপন্যাসের চরিত্রের মতো অর্ঘ কালজয়ী কোন সিনেমা বানিয়ে ফেলেনি। তবে সেটা ভালো কিছুর শুরু ছিল। এখন অর্ঘ ভার্সিটিতে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে ওর ছবি দেখানো হয়।

তোমরা যাঁরা সিনেমা বানাতে চাও; কিন্তু ক্যামেরা নেই, এত টাকা কোথায় পাবো, এডিটিং কীভাবে করে জানি না’র দলে  তাদের জন্য রইলো অর্ঘের কিছু টিপস।

১. চরিত্রের সংখ্যা যথাসম্ভব কম নিয়ে কাজ করো:

কেননা একদম শুরুতেই বেশি সংখ্যক চরিত্র নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। সবার একসঙ্গে সময় মিলে না। অনেক বেশি ‘কন্টিনিউইটি ব্রেক’ হয় অর্থাৎ এক দৃশ্যে চরিত্র হয়তো লাল জামা পরেছে, কোনো কারণে ঐদিন আর শুট করা সম্ভব হয়নি। পরদিন একই দৃশ্যে চরিত্র সবুজ জামা পরে অভিনয় করছে। যেটা তুমি ফিল্মের শূটিং শেষে এডিট করার সময় চোখে পড়বে। এইরকম বিষয়গুলো বেশি চরিত্র নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

২. শুটিং এর জন্য দুপুরবেলার সময় বেছে নাও:

দুপুরবেলা শুটিং করলে আলো নিয়ে তোমার কোন চিন্তাই করা লাগবে না। কারণ দুপুরবেলা পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো থাকে এবং অনেক দীর্ঘসময় একইরকম আলো থাকে। তাই এক্সট্রা লাইট প্রয়োজন হয় না এবং কোন দৃশ্যে আলো কম, কোন দৃশ্যে বেশি; এটা মনে হবে না। সকাল কিংবা বিকালের দিকে আলো খুব দ্রুত চেইঞ্জ হয়ে যায় তাই সব দৃশ্যে আলোর সামঞ্জস্য থাকে না। তবে গল্পের প্রয়োজনে সকালে কিংবা সন্ধ্যা রাতে শুটিং করতে পারো। তবে চেষ্টা করবে দুপুর ১২টা থেকে ৩টা/৪টার মধ্যে শুটিং করার। আরেকটা বিষয়, স্ক্রিনে আলো বেশি থাকলে সেটা এডিংয়ে প্রয়োজনমত কমানো যাবে। আলো কম থাকলে সেটা বাড়ানো যাবে; কিন্তু ভালো লাগবে না।

৩. নিজের সাধ্য বুঝে গল্প বাছাই করো:

তুমি হয়তোবা অনেক অ্যাকশনধর্মী, হরর, ইলিউশন নিয়ে সিনেমা দেখেছো। যা তোমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যা দেখে তুমি তোমার গল্পে সেইসব দৃশ্য রাখার জল্পনা-কল্পনা করেছো। কিন্তু সিনেমার কাজ শুরু করার পর দেখছো সেগুলো করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ তার জন্য প্রয়োজন অনেক অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা এবং বাজেট। যার কোনোটাই এখন তোমার ঝুড়িতে নেই। তাই নিজের সাধ্যের বাইরে গল্প ছেড়ে নিজের পরিস্থিতি বিবেচনা করে গল্প নিয়ে কাজ করা উচিত। এইরকম কাজ করতে করতেই একদিন তুমি অনেক বড় ডিরেক্টর হয়ে উঠবে। তখন জল্পনা-কল্পনা করা দৃশ্যগুলো উপস্থাপন করা তোমার জন্য ছেলেখেলা হয়ে যাবে।

৪. তোমার সঙ্গীত শিল্পী বন্ধুই হতেই পারে তোমার ফিল্মের সঙ্গীত পরিচালক:

আমাদের সবার জীবনেই সেই একজন বন্ধু আছে যার বাসায় একটি গিটার আছে এবং সে ঐ গিটারে সারাদিন টুংটাং করে। স্কুলের অনুষ্ঠান, বন্ধুর জন্মদিন কিংবা কোন কারণ ছাড়াই তাকে গিটার বাজাতে দেখা যায়। সে প্রচুর দেশি-বিদেশি গান শুনে। এবং বিকালের আড্ডায় সঙ্গীত বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান ঝাড়ে। হ্যাঁ, এই বন্ধুটিই তোমার সিনেমার মিউজিক নিয়ে কাজ করতে পারবে। ইন্ট্রো, আউট্রো, ক্লাইম্যাক্সে কী ধরণের মিউজিক ভালো লাগবে সেটা ওর থেকে ভালো আমরা বুঝবো না। তাছাড়া সিনেমায় গান লাগবে? ওকেই বলো না! শুধু শুধু অনুমতি ছাড়া অন্যের গান ব্যবহার করে কপিরাইটের ঝামেলা এড়াতে নিজেরাই গান বানিয়ে নাও। তোমার বন্ধু শুরুতে উদাসী ভাব দেখালেও দিনশেষে গান করে দিবো। সেই গানটির কারণেই হয়তোবা অনেকে তোমার সিনেমার কথা মনে রাখবে।

বিশেষ সতর্কতা: সবসময় কপিরাইট ফ্রি মিউজিক ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। বর্তমানে অনেক মিউজিসিয়ান তাদের মিউজিক কপিরাইট ফ্রি করে রেখেছে কমার্শিয়াল ও নন-কমার্শিয়াল নির্মাতাদের জন্য। সেগুলো তোমরা ব্যবহার করতে পারবে। তাহলে সোশ্যাল ভিডিও প্ল্যাটফর্মে কোন ঝামেলা ছাড়াই তোমার ফিল্ম আপলোড করতে পারবে।

৫. মুঠোফোনের ক্যামেরাই হতে পারে তোমার গল্প বলার যন্ত্র:

‘গল্প মাথায় আছে, কিন্তু ক্যামেরাই নাই।’ এই এক বাক্যেই পৃথিবী যে কত চমৎকার প্রতিভা হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। বর্তমানে আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তোমার হাতের মুঠোফোন ১০ বছর আগের অনেক ক্যামেরার থেকে হাজারগুণ ভালো। সুতরাং এই অজুহাত না দিয়ে কীভাবে এটা কাজে লাগানো যায় সেটা ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তোমার বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ডের দূরত্ব হয়তো পাঁচ মিনিটের। কিন্তু এইটুকু রাস্তায় হয়তোবা লুকিয়ে আছে পাঁচ হাজার গল্প। তুমি কখনো ক্যামেরার চোখে কখনো সেটা দেখনি। চোখ, কান এবং মুঠোফোনের ক্যামেরা চালু রেখে চারপাশটা দেখো। প্রতিদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লিপ জুড়ে দিলে দাঁড়িয়ে যাবে তোমার জীবনের প্রথম সিনেমা।

৬. তোমার মতো আগ্রহী আর নানা কাজে পারদর্শী বন্ধুদের খুঁজে বের করো:

তোমার যেই বন্ধু ক্লাসে পড়া ফাঁকি দিয়ে লাস্ট বেঞ্চে বসে গভীর মনোযোগে খাতায় আঁকিবুঁকি করে; সে কিন্তু তোমার সিনেমায় অ্যানিমেশনের কাজ করতে পারে। ক্লাসের স্যার ওর প্রতিভার দাম না দিলেও তুমি এই ভুল করোনা। তোমার কোন বন্ধু হয়তো কম্পিটারের পোঁকা, তাকে একটু ভিডিও এডিংটা শিখে ফেলতে বলো। এখন ইন্টারনেটেই সব শেখা যায়। তোমার যেই বন্ধু একটু ফ্যাশন সচেতন, সারাদিন চুলের যত্ন নেয়; সে হতে পারে তোমার মেকআপ আর্টিস্ট। আর তোমার সবকিছুতে পরিপাটি বন্ধু হতে পারে তোমার সহকারী পরিচালক। সে সব কাজ গুছিয়ে করার দায়িত্ব নিবে। এইতো দাঁড়িয়ে গেল তোমার টিম। এবার সারাদিন ফেসবুকে সুন্দর ছবি আপলোড দেয়া বন্ধুটিকে ডেকে ধরিয়ে দাও ক্যামেরা এবং তুমি একটি হ্যাট মাথায় দিয়ে নেমে পড়ো সিনেমা বানানোর কাজে।

পুনশ্চঃ লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন বলার পর অতি উত্তেজনায় ক্যামেরার রেকর্ডিং বাটনে চাপ দিতে ভুলো যেও না কিন্তু!

 


 

আইডিয়া: সাইয়েদুল আবরার (Sayedul Abrar)

লেখা: মাহমুদ সৌরভ (Mahmud Shourov)

অলঙ্করণ: সুবিনয় মুস্তফী ইরন (Subinoy Mustofi Eron)

 

Tags:

© 2019 Children's Film Society Bangladesh

This website is designed & supported by Hootum Bangladesh Limited

Log in with your credentials

Forgot your details?