গল্পটা অনেক পুরোনো। সেই দশ বছর আগের। সাল ২০০৬, ভারতের শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে “দুরত্ব” চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শেষ করে দেশে ফিরেছেন মোরশেদুল ইসলাম। মাথায় ঘুরছে এক নতুন চিন্তা। কিভাবে বাংলাদেশেও করা যায় এমন একটি শিশু চলচ্চিত্র উৎসব। যেই বলা সেই কাজ। সবার আগেই আইডিয়াটা জানালেন তিনি নিজের পরিবারকে। খাবার টেবিলে বসে শুরু হলো প্ল্যানিং। তৈরি হলো নতুন একটি সংগঠন, চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ।

r-m-mononতারপর জার্মান কালচারাল সেন্টারে নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে শুরু করে নয়টি সফল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরো যাত্রাটিতেই মোরশেদুল ইসলামের সহযোগী পরিচালক এবং পরবর্তীকালে নিজেই উৎসব পরিচালক হয়ে ওঠা মানুষটির নাম রায়ীদ মোরশেদ, সিএফএস এর সবার প্রিয় মনন ভাইয়া।

“প্রথমে সিএফএস এ এসেছিলাম বাবার সহযোগী হিসেবে। মোরশেদুল ইসলামের সন্তান বলেই তাকে অন্যসব কাজের মতো সিএফএস তৈরি করার কাজেও সহযোগিতা করি। সেখান থেকেই সিএফএস এর জন্য গড়ে উঠলো এক অদ্ভুত ভালোবাসা।”, রায়ীদ মোরশেদের সরল স্বীকারোক্তি।

সিএফএস এর শুরু থেকেই তিনি কাজ করছেন অনুষ্ঠান সম্পাদক পদে। তাই উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্য যে কারও চেয়ে তার অবদান থাকে সবচেয়ে বেশি। কথা হয় তার সাথে উৎসব আয়োজনের অনুভূতি নিয়ে।

“অনেক ব্যস্ততা থাকলেও, এই উৎসবের প্রতিটা মুহূর্ত আমি উপভোগ করি। বাচ্চারা ছবি দেখার পরে চোখে মুখে যে আনন্দ নিয়ে বের হয়, সেটাই আমার কাজের প্রেরণা যোগায়।” রায়ীদ মোরশেদের কথাই যেন আরেকবার বুঝিয়ে দেয়, কিসের আনন্দে প্রতিবছর এত ছেলেমেয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেয় এ উৎসবে।

“এসএসসি পরীক্ষা থাকার কারণে, প্রথম উৎসবে আমি কাজ করেছি কিছুটা পর্দার আড়ালে। দ্বিতীয় উৎসব থেকে শুরু হয় প্রতিযোগিতা বিভাগ। সেখানে আমি জুরি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করি। তৃতীয় উৎসব থেকে শুরু হয় আমার দাপ্তরিক কাজকর্ম। সেই উৎসবে আমি ফেস্টিভাল প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করি। তারপর পর্যায়ক্রমে সহকারী উৎসব পরিচালক এবং উৎসব পরিচালক।”

এই দীর্ঘ যাত্রায় “ফেস্টিভাল প্রোগ্রামার” পদটাকেই সবচেয়ে ভালোবেসেছেন বলে জানালেন রায়ীদ মোরশেদ। এছাড়া উৎসব সংক্রান্ত কাজগুলোর মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ, উৎসবের চলচ্চিত্র নির্বাচন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা চলচ্চিত্রগুলোর প্রতিটি দেখে দেখে নির্বাচনের গুরুদায়িত্বটি পালন করেন তিনিই। তবে এখন তার সাথে যুক্ত হয়েছে সিএফএস এর আরও বেশকিছু দক্ষ সদস্য।

day-1_tushar-143

উৎসব পরিচালক হিসেবে, ৯ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের পর অবসর নিয়ে রায়ীদ মোরশেদ এখন উৎসবের নির্বাহী উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত। নতুন পরিচালনা দল নিয়ে তিনি কতটা আশাবাদী জিজ্ঞেস করলে তার কন্ঠে ফুটে ওঠে একরাশ আনন্দ। “নতুনদের নিয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী, ওদেরকে আমি শিখিয়েছি। ওরা কাজ বোঝে। আমি জানি ওরা আমাকে নিরাশ করবে না।”

অক্লান্ত পরিশ্রম, নেই কোনো পারিশ্রমিক, তবুও কিসের টানে প্রতিবছর উৎসব আয়োজন থেকে শেষ পর্যন্ত এই কঠিন কাজটি করে যাচ্ছেন তিনি?
“শুরুতে এসেছিলাম শুধুই বাবার সহযোগী হিসেবে। তারপর যত দিন গেলো, উৎসবে আনন্দ পেতে লাগলাম। ছোটদের সাথে কাজ করে এক অতুলনীয় আনন্দ পেলাম। যত দিন যেতে লাগলো, উৎসবে বড় হতে লাগলো। সেই সাথে বাড়তে লাগলো আনন্দ, বাড়তে লাগলো দায়িত্ব।”

উৎসব পরিচালক হিসেবে নিজের মূল্যায়ণ করলেন রায়ীদ, “আমি যখন উৎসব পরিচালকের দায়িত্ব পাই, তখন দেশের অবস্থা খারাপ ছিলো। এমন অবস্থায় একটি আন্তঃর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব করা ছিলো যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। তারপরেও নিজ জায়গা থেকে যতটা করা সম্ভব, আমি চেষ্টা করেছি।”

12654449_10207684212357609_1494082417843599253_n

উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে একটি সমস্যার কথা একটু যেন ক্ষোভের সাথেই জানালেন তিনি, “উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা পৃষ্ঠপোষক। এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশের কর্পোরেটরা মানতেই পারেন না কেন একটি শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা খরচ হবে! পর্যাপ্ত সহায়তা পেলে আজ এই উৎসবটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর একটি হতে পারতো।”

তবে এই একটি ক্ষোভ ছাড়া হিসেব করলে সিএফএস থেকে রায়ীদের প্রাপ্তি কিন্তু কম নয়। সিএফএস এর অনেক সদস্যের চোখেই তিনিই সবচেয়ে সফল উৎসব পরিচালক।

চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি নিয়ে রায়ীদ মোরশেদের চিন্তা কিন্তু এখানেই থেমে নেই। উৎসব পরিচালক হিসেবে অবসর নিলেও থেমে নেই সিএফএস নিয়ে তার স্বপ্ন দেখা। তার ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে থাকার ইচ্ছে না থাকলেও আমি বাংলাদেশের শিশু চলচ্চিত্রের বিকাশে কাজ করতে চাই। ইচ্ছে আছে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করার, যেখানে শিশু চলচ্চিত্র সর্বাধিক অগ্রাধিকার পাবে। এছাড়াও ইচ্ছে আছে দেশব্যপি কিছু সিনেমা হল চালু করার, যেগুলো উৎসবের সাতদিন উৎসবের ভেন্যু হিসেবে কাজ করবে। আমার এসব কাজ থেকে পাওয়া অর্থ আমি ব্যয় করতে চাই উৎসবে।”

স্বপ্ন সত্যি হোক রায়ীদ মোরশেদের। কারণ তার স্বপ্নই যে সিএফএস এর সকল সদস্যের স্বপ্ন!

 

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন:

ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলী
Riddha Anindya Ganguly

ঋদ্ধ, সিএফএস এর পুরনোতম সদস্যদের একজন। কাজ করছেন সিএফএস এর জন্মলগ্ন থেকে। প্রথম উৎসবে “শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক” পদক পান তিনি। দ্বিতীয় উৎসবে জুরি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং বর্তমানে উৎসবের মুখপত্র “আমাদের উৎসব” এ সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। পড়াশুনা করছেন ঢাকা কমার্স কলেজে, উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে।